সংক্রামক রোগ
ভূমিকা
সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তা মহামারি হলে। আজ থেকে ১০ হাজার বছর আগে মানুষ যখন কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে থিতু হয়, তখনই মূলত গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় তৈরির ধারণা আরও পোক্ত হয়। আর সেই সময় থেকেই সংক্রামক রোগ মহামারিতে রূপ নিতে শুরু করে। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্ত প্রভৃতি বিভিন্ন রোগ নানা সময়ে মহামারির আকার নিয়েছে। মানবসভ্যতা যত উন্নত হয়েছে, মহামারির প্রাবল্য তত বেড়েছে। কারণ, ধীরে ধীরে শহর, গ্রাম গড়ে উঠেছে, জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়েছে। এ ছাড়া বেড়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ও বাণিজ্য। ফলে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। তথ্যসূত্র

দেশের সার্বিক পরিস্থিতি
নীতিমালা সমূহ
আইন সমূহ
আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা
আদালতের মামলা এবং রায়
গবেষণা ও প্রকাশনা
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি
বাংলাদেশে শীতকালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ৭০ থেকে ৮০ ভাগই রোটা ভাইরাসের সংক্রমণে অসুস্থ হয়। এটা মুখের মধ্য দিয়েই শিশুদের পাকস্থলীতে প্রবেশ করে। বড়দের ক্ষেত্রে রোটা খুব একটা দুর্বল করতে পারে না। প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরের রোটা ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষমতা যথেষ্ট থাকে।
অ্যান্টি মাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স এএমআর এমন একটি সমস্যা যা সংকটে রূপ নিতে পারে। এর কারণে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ প্রাণহানি হতে পারে। এটি প্রতিরোধে আমদের টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সুতরাং, এএমআর সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই।
কলেরা একটি অতি প্রাচীন রোগ৷ বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ এই রোগের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যার সিংহভাগ রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়৷ বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষ কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছে৷ এই রোগটির জন্য প্রধানত ‘ভিব্রিও কলেরি’ নামের একটি জীবাণু দায়ী৷
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের ‘হেলথ বুলেটিন’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধিতে যাদের মৃত্যু হয় তার ১০% শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাজনিত কারণে। এই বুলেটিন অনুযায়ী, শিশু মৃত্যুর যে ১০টি প্রধান কারণ রয়েছে তার মধ্যে দুই নম্বরে রয়েছে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বলছে, খাদ্যবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ডায়রিয়া, কলেরা, জন্ডিস ও টাইফয়েড। গতকাল রোববার আড়াই বছর ধরে চলা আইইডিসিআরের জরিপের তথ্য প্রতিষ্ঠানটির মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে ১১ দফায় খাদ্যবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। আর ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫-তে। ২০১৩ সালে চার দফায় এমন রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। কোনো একটি রোগ হঠাৎ করে বেড়ে গেলে সেটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রাদুর্ভাব বলা হয়।
বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২০ ও ২০২১ সালে করোনাভাইরাস মহামারিতে বাংলাদেশে ২৯ হাজারের কম মানুষ মারা গেছে।
বর্তমান নীতিমালা সমূহ
জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি ২০১১ এর কর্মকৌশল ৩৩ এ বলা হয়েছে, সমন্বিত উপায়ে অসংক্রমাক রোগের চিকিৎসা, প্রতিরোধ, পূর্ণবাসন করা হবে। সচেতনতার পাশাপাশি জীবনধারা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হবে।
বর্তমান আইন সমূহ
জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন এবং বিশেষতঃ আরোগ্যের প্রয়োজন কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতীত মদ্য ও অন্যান্য মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন৷
জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা মোকাবেলা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি হ্রাসকরণের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের উদ্দেশ্যে বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত আইন। এ আইন অনুসারে সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে যে কোনো গণজমায়েত, পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণাসহ যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। আইনটির ১১ ধারায় সংক্রমিত এলাকা ঘোষণা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ১৪নং ধারা অনুযায়ী সংক্রমিত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে রাখার সুযোগ আছে। এছাড়া ১৮ ও ১৯ ধারা অনুযায়ী কোনো যানবাহনে সংক্রামক জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেলে ওই যানবাহনের মালিককে তা জীবাণুমুক্তকরণের আদেশ দেয়া যাবে এবং প্রয়োজনে জব্দও করা যাবে। আইনের ২০ ধারায় বলা আছে, ‘সংক্রামক রোগে কেউ মৃত্যুবরণ করিলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের নির্দেশনা মোতাবেক দাফন বা সৎকার করিতে হইবে।’
আইনটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধারাগুলো হল ২৪, ২৫ ও ২৬। সংক্রামক রোগ গোপন করা যে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এ আইন ভঙ্গ করলে যে শাস্তি ও দণ্ড দেয়ার বিধান আছে, তা এ ধারাগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও আইন অমান্যকারীদের শাস্তি দেয়া যায়।
২৪ ধারামতে, যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক জীবাণুর বিস্তর ঘটান বা ঘটাতে সাহায্য করেন বা জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংক্রমিত ব্যক্তি বা স্থাপনার স্পর্শে আসার সময় সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি তার কাছে গোপন করেন, তাহলে ওই অপরাধের জন্য তিনি ছয় মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
২৫ ধারার বিধানমতে, যদি কোনো ব্যক্তি মহাপরিচালক, সিভিল সার্জন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাধা দেন বা নির্দেশ পালনে অসম্মতি জানান, তাহলে তিনি তিন মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
২৬ ধারার বিধানমতে, সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা সত্ত্বেও কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল/মিথ্যা তথ্য দিলে তার শাস্তি দুই মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। তাছাড়া এ আইনে অভিযোগ দায়ের, তদন্ত, বিচার ও আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে। অপরাধগুলো অ-আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য, যা আইনের ২৭ ও ২৮ ধারায় আলোচনা করা হয়েছে।
অননুমোদিত পদ্ধতিতে রক্ত পরিসঞ্চালনের দণ্ড২০৷ (১) কোন ব্যক্তি রক্ত পরিসঞ্চালন সংক্রান্ত চিকিত্সার উদ্দেশ্যে কোন রোগী বা রক্ত গ্রহীতার মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি, অংগহানী, পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর কারণ হয় কিংবা রক্তবাহিত সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হন এইরূপ পদ্ধতিতে রক্ত পরিসঞ্চালন করিবেন না৷
২৯৷ মহাপরিচালক বা তাহার নিকট হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন ভেটেরিনারি কর্মকর্তা, এই আইন ও তদধীন প্রণীত বিধির বিধান সাপেক্ষ, যুক্তিসঙ্গত সময়ে, তাহার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা সহকারে নিম্নবর্ণিত উদ্দেশ্যে যে কোন খামার, পশু রাখিবার স্থান, ভূমি, দালান-কোঠা বা পশুজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা, অন্য কোন স্থান বা যানবাহনে প্রবেশ করার অধিকারী হইবেন, যথা:-
(ক) এই আইন বা বিধির অধীন তাহার উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদন;
(খ) রোগাক্রান্ত পশু পরীক্ষা;
(গ) রোগাক্রান্ত পশু দ্বারা সংক্রমিত হইয়াছে এইরূপ পশু পরীক্ষা;
(ঘ) পশু হইতে উত্পাদিত পণ্য পরীক্ষা;
(ঙ) সংক্রামক রোগে আক্রান্ত পশুর ব্যবহার্য দ্রব্যাদি, খড়, ঘাস ইত্যাদি পরীক্ষা; এবং
(চ) সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে প্রদত্ত অন্য কোন দায়িত্ব সম্পাদন৷
স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ -র সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “সংক্রামক ব্যাধি” অর্থ এমন ব্যাধি যাহা একজন ব্যক্তি হইতে অন্য ব্যক্তিকে সংক্রমিত করে এবং সরকার কর্তৃক সরকারি গেজেটে প্রকাশিত অন্য যে কোন ব্যাধিও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে;
পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রন আইন, ২০১১ -এ পশু জবাই, মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনের সহিত সংশ্লিষ্ট সকল কর্মী সংক্রামক অথবা ছোঁয়াচে রোগমুক্ত কিনা, তাহা উপযুক্ত চিকিৎসক কর্তৃক প্রত্যায়িত হইতে হইবে এবং উপযুক্ত চিকিৎসক কর্তৃক প্রদত্ত সনদপত্র জবাইখানা, মাংস বিক্রয় স্থাপনা, মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মালিক, ব্যবস্থাপক বা অন্য কোন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংরক্ষণ করিবেন এবং প্রয়োজনে ভেটেরিনারি কর্মকর্তা বা ভেটিরিনারিয়ানকে প্রদর্শন করিতে বাধ্য থাকিবেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ -র সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, বিষয় বা প্রসঙ্গের পরিপন্থী কোন কিছু না থাকিলে, এই আইনে- মহামারী সৃষ্টিকারী ব্যাধি, যেমন প্যান্ডেমিক ইনফ্লু্য়েঞ্জা, বার্ডফ্লু, এনথ্রাক্স, ডায়রিয়া, কলেরা, ইত্যাদি; এবং ক্ষতিকর অণুজীব, বিষাক্ত পদার্থ এবং প্রাণসক্রিয় বস্তুর সংক্রমণসহ জৈব উদ্ভূত বা জৈবিক সংক্রামক দ্বারা সংক্রমণকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন, ২০১১ সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘‘বালাই নির্জিবীকরণ (disinfestation) ’’ বা ‘‘সংক্রামক জীবাণু নাশকরণ (disinfection) ’’ অর্থ উদ্ভিদ বা উদ্ভিদজাত দ্রব্যাদির উপরে, ভিতরে বা মধ্যস্থিত অংশে থাকে বা থাকিতে পারে এমন যে কোন পোকামাকড় বা রোগ জীবাণুর সংক্রমণ ধ্বংস বা হ্রাস করিবার উদ্দেশ্যে গৃহীত যে কোন বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা;
The Mining Settlements Act, 1912- এ বোর্ডকে মাইনে কর্মরত শ্রমিকদের মাঝে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্রবিধান তৈরির পদক্ষেপ গ্রহনের কথা বলা হয়েছে।
The Cantonments Pure Food Act, 1966 খাদ্যে বিষাক্ততা বা ক্ষতিকর উপাদান থাকলে এ আইনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
রেলওয়ে প্রশাসন সংক্রামক বা সংক্রামক ব্যাধিতে ভুগছেন এমন যাত্রীদের বহন করবে এমন শর্তগুলি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এবং এই ধরনের যাত্রীদের দ্বারা ব্যবহৃত গাড়িগুলিকে জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহন করবে।
আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা
আন্তর্জাতিক চুক্তি International Charter of Physical Education and Sport of the United Nations Educational Scientific and Cultural Education (UNESCO) অনুচ্ছেদ-১ অনুসারে “শারীরিক শিক্ষা এবং খেলাধুলার অনুশীলন সবার জন্য একটি মৌলিক অধিকার” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। যাই হোক, যেহেতু শারীরর্চ্চার অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ্য করা হয়নি, তাই এই বিষয়টি সর্বজন স্বীকৃতি মানবাধিকার সাথে সম্পৃক্ত বিষয় সাথেই যুক্ত করা ভাল। যেহেতু স্বাস্থ্যের অধিকার একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তাই শারীরর্চ্চার অধিকার সুপষ্টভাবেই স্বাস্থ্য অধিকারের একটি অংশ।
আদালতের মামলা এবং রায়
গবেষণা ও প্রকাশনা
র